বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৬ অপরাহ্ন

দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

খাদ্য সংকটে ঘোড়ার মৃত্যুতে তদন্ত কমিটি গঠন: বেলার নিগ্যাল নোটিশ

আবদুল আজিজ:
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে খাদ্য সংকটে ঘোড়ার মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। অপরদিকে উক্ত ঘটনায় সুস্থ ও মৃত ঘোড়াগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ১৩জনকে লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)।

অপরদিকে, একের পর এক ঘোড়া অসুস্থ ও মৃত্যুর ঘটনায় কক্সবাজার জেলার সচেতন মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে ঘোড়া গুলো দিয়ে মালিক নামধারী একশ্রেণীর মানুষ সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের বহনসহ নানা সেবার অজুহাতে গলাকাটা ব্যবসা করে বিপুল অর্থ আয় করেছেন। কিন্তু, আজ করোনার সংকটে ঘোড়াগুলোকে অর্থ সংকটের অজুহাতে রাস্তায় ছেড়ে দিয়েছে। একারণে রাস্তার ময়লা আবর্জনা খেয়ে অসুস্থ্য হয়ে মৃত্যু হচ্ছে এবং অসুস্থ হয়ে পড়ছে অনেক ঘোড়া। তাই, ঘোড়াগুলোকে খাদ্য সহায়তার দেয়ার আগে ঘোড়া মালিকদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

গত দুইমাস করোনার দ্বিতীয় ঢেউতে সংক্রামণরোধে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ও বিনোদনকেন্দ্র গুলোতে পর্যটক নিষিদ্ধ থাকায় অর্থ সংকটে পড়ে ঘোড়া মালিকরা। এতে করে ঘোড়ার প্রয়োজনীয় খাদ্য সংকট ও নানা কারণে ঘোড়াগুলো অসুস্থ এবং মৃত্যু হচ্ছে। চলতি বছরে খাদ্য সংকট ও নানা কারণে ৬টি ঘোড়া মারা যায়। উক্ত ঘটনায় কক্সবাজার সহ সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা: অসীম বরণ সেন জানান, ‘খাদ্য সংকটে পড়ে ঘোড়া মারা যাওয়ার বিষয়টি সত্য নয়। এরপরও বিভিন্ন মিডিয়ায় খবরটি আসার পর প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উক্ত কমিটিকে আগামী তিনদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। কমিটিতে কক্সবাজার প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের ভেটেরিনারি সার্জন ডা: নেবু লাল দত্তকে প্রধান করা হয়েছে। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন কক্সবাজার প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের উপ-সহকারি কর্মকর্তা ডা: মিজবাহ উদ্দিন কুতুবী ও ডা: এহসানুল হক।

তিনি আরও বলেন, ‘লকডাউনের পর থেকে দ্বিতীয় দফা ঘোড়া মালিকদেও ঘোড়ার জন্য ভূষি ও প্রয়োজনীয় খাদ্য বিরতরণ করা হয়েছে। কিন্তু, খাদ্য অভাবে মৃত্যুর ঘটনাটি তদন্ত হওয়া প্রয়োজন মনে করেন আমার অফিস। তাই, উক্ত তদন্ত কমিটি খাদ্য সংকট আছে কিনা, কতটি ঘোড়ার মৃত্যু হয়েছে এবং অসুস্থ কতটি ঘোড়া সবদিক অনুসন্ধান করবে।’

কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুরাইয়া আকতার সুইটি জানিয়েছেন, ‘করোনায় লকডাউনে অসহায় মানুষের খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি কক্সবাজার সৈকতের ঘোড়াগুলোর জন্য মালিকদেও পশুখাদ্য হিসাবে ভূষির বস্তা বিতরণ করা হয়েছে। বর্তমানে দ্বিতীয় দফা ভূষি বিতরণ করা হয়েছে। সবমিলে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিয়েছে প্রশাসন।

কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু জানান, ‘আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে কোন প্রকার ঘোড়া চলাচল করতে পারবে না। কারণ, এসব ঘোড়া সমুদ্র সৈকতে মল ত্যাগের মাধ্যমে পরিবেশ দুষিত করে এবং পর্যটকদের অবাধ চলাচলের উপর বাধা সৃষ্টি করে। এছাড়াও ঘোড়ার মালিকরা ঘোড়াকে পুঁজি করে পর্যটকদের কাছ থেকে গলাকাটা বানিজ্য করে। এনিয়ে অসংখ্য অপ্রীতিকর ঘটনার ঘটেছে। তাই এসব ঘোড়া গুলোর মৃত্যু, অসুস্থ সহ নানা কারণের জন্য প্রধান দায়ী মালিকরা। তাই, ঘোড়ার মৃত্যুর জন্য এসব মালিকদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি সমুদ্র সৈকতে ঘোড়া চলাচলের উপর নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন এই পরিবেশ সংগঠক।’

‘আমরা কক্সবাজারবাসী’ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন জানিয়েছেন, ‘পশুগুলোর উপর মালিক পক্ষের অমানুবিক আচরণে আমরা ক্ষুব্দ। মালিকরা এতদিন ধরে ঘোড়াগুলোকে দিয়ে টাকা আয় করেছে। আজ করোনা সংকটে ঘোড়াগুলোতে দূরে ঠেলে দিয়েছে। তাই, ঘোড়া মালিকদের গ্রেপ্তার না করে খাদ্য সহায়তা দু:জনক। এসব রোগাক্রান্ত ঘোড়া করোনা সহ বিভিন্ন রোগ ছড়ায়। সমুদ্র সৈকত দষিত করে। এই ঘোড়াগুলো সরকারি হেফাজত বা কোন পার্কে রাখার দাবি জানাচ্ছি’।

কক্সবাজার ঘোড়া মালিক সমিতির সভাপতি আহসান উদ্দিন নিশান জানিয়েছেন, লকডাউনে ঘোড়া মালিকরা খুবই বেকায়দায় রয়েছে। ঘোড়া গুলোকে দৈনিক প্রয়োজনীয় খাবার যোগান দিতে না পেরে এবং নানা কারণে চলতি বছরে ৬টি ঘোড়া মারা গেছে। প্রতিটি ঘোড়ার মুল্য ৪৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা। মারা যাওয়ার পেছনে ঘোড়া খাদ্য সংকটসহ নানা কারণ রয়েছে। এই খাদ্য সংকটে পড়ে কিছু কিছু মালিক ঘোড়া শহরে ছেড়ে দিয়েছে। যার কারণে নানা কারণে এসব ঘোড়ার মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে, খাদ্য সংকটে ঘোড়ার মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ১৩জনে বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছেন। বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্ট ও বেলার নিযুক্ত আইনজীবী সাঈদ আহমেদ কবীর স্বাক্ষরিত উক্ত লিগ্যাল নোটিশে মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিলের সভাপতি, কক্সবাজার জেলা প্রশাসক, কক্সবাজার পুলিশ সুপার, কক্সবাজার পৌর মেয়র, কক্সবাজার জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, কক্সবাজার সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ও কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রয়েছে।

নোটিশে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক মহামারী সংকটকালীন সময়ে পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় কক্সবাজারে বছরব্যাপি আর্থিক জোগানের উৎস এ ঘোড়া খাদ্যের অভাবে মারা যাচ্ছে। সম্প্রতি দেশের জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী খাবারের অভাবে দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়েছে সৈকতে পর্যটকদের বিনােদন দেয়ার কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে। খাদ্যের অভাবে ঘোড়াগুলো রাস্তার পাশে ফেলা প্লাস্টিক বা পলিথিন বর্জ্য খেয়ে ফেলছে। যার কারণে দীর্ঘ মেয়াদী অসুস্থতার শিকার হচ্ছে। দেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোন প্রাণীকে প্রয়োজনীয় খাদ্য প্রদান না করা এবং অসুস্থ অবস্থায় লোকালয়ে মুক্ত করে দেওয়া প্রাণীর প্রতি অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুর আচরণ হিসেবে গন্য হবে এবং তা দ-নীয় অপরাধ। এ অবস্থায় নোটিশের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) এবং পিপল ফর এ্যানিমল ওয়াল্ডফেয়ার ফাউন্ডেশন (পিএডাব্লিউ) অনতিবিলম্বে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে বিদ্যমান ঘোড়া, ঘোড়ার মালিক ও তত্ত্বাবধায়কগণের তালিকা প্রস্তুতপূর্বক জীবিত ও সুস্থ্য ঘোড়াগুলোর জন্য নিরাপদ আবাসন ও খাদ্য নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান। একইসাথে অসুস্থ ঘোড়াগুলোকে আটক করে সরকারী ভেটেরিনারি হাসপাতালে চিকিৎসা ও পরিচর্যার জন্য প্রেরণের অনুরোধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে আগামী ৫ (পাঁচ) দিনের মধ্যে নিমস্বাক্ষরকারীকে গৃহিত বিষয়াদি অবহিত করার অনুরোধ করা হয়েছে। অন্যথায় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, করোনার দ্বিতীয় ঢেউতে সংক্রামণরোধে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ও বিনোদনকেন্দ্র গুলো নিষিদ্ধ করে স্থানীয় প্রশাসন। এ অবস্থায় খাদ্য সংকটে পড়ে সৈকতে পর্যটকদের জন্য বিনোদন দেয়া ঘোড়াগুলো। এতে করে মালিকদের পক্ষে ঘোড়াগুলোকে প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত খাবার যোগান দিতে না পেরে নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে চলতি বছরে মারাগেছে ৬টি ঘোড়া। বর্তমানে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের বিনোদন দেয়ার জন্য দীর্ঘদিন ৫৫টি ঘোড়া ব্যবহার হয়ে আসছে। এসব ঘোড়া মালিকদের ২২জন সদস্য বিশিষ্ট ‘কক্সবাজার ঘোড়া মালিক সমিতি’ নামের একটি সমিতি রয়েছে। উক্ত সমিতির বাইরে আরও ১০টি ঘোড়া সহ মোট ৬৫টি ঘোড়া রয়েছে কক্সবাজার জেলায়। এসব ঘোড়াগুলো কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের পিঠে চড়ে এবং ছবি উঠিয়ে নানাভাবে বিনোদন উপভোগ করে। এর বাইরেও ঘোড়ার গাড়ি, বিয়ে-শাদী ও বিভিন্ন উৎসবেও ঘোড়াগুলোর ব্যবহার হয়। যার বিনিময়ে ঘোড়া মালিকরা পায় কিছু অর্থ। এসব অর্থ দিয়ে নিজেদের সংসারের পাশাপাশি ঘোড়াগুলোর লালন-পালনে ব্যয় করা হয়। কিন্তু, চলতি বছরের ১লা এপ্রিল থেকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউতে সংক্রামণরোধে লকডাউন ঘোষনা করে এবং সমুদ্র সৈকত সহ বিনোদনকেন্দ্র গুলো বন্ধ করে দেয় জেলা প্রশাসন। যার কারণে পর্যটক শুন্য হয়ে পড়ে কক্সবাজার। ফলে অন্যান্য পর্যটন ব্যবসায়ীদের মত বেকায়দায় পড়ে যান ঘোড়া মালিকরা। এতে করে নিজেদের অভাবের পাশাপাশি খাদ্য সংকটে পড়ে ঘোড়াগুলো। লকডাউনে ঘোড়া মালিকদের অসহায়ত্ব দেখে কক্সবাজার সদর উপজেলা প্রশাসন ২০০ বস্তা ভূষি বিতরণ করে। এতে ঘোড়া মালিকদের বিছুটা অর্থ লাগব হলেও খাদ্য সংকট পিছু ছাড়েনি। লকডাউনের এই খাদ্য সংকটে মারা যায় ৩টি ঘোড়া। এছাড়াও কুকুরের কামড়ে অসুস্থ্য হয়ে ২টি এবং সড়ক দুর্ঘটনায় ১টি ঘোড়া মারা যায়।

এদিকে, কক্সবাজার সৈকতের ঘোড়াগুলোর খাদ্য সংকটের খবরে একটি ব্যবসায়ীক কোম্পানি এক মাসের খাদ্য সহায়তা দিতে এগিয়ে এসেছে।

ভয়েস/জেইউ।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023
Developed by : JM IT SOLUTION